রবীন্দ্রনাথ
‘তোমার পায়ের পাতা সবখানে পাতা, কোনখানে রাখব প্রণাম?’

উত্তম দত্ত
‘সমস্ত ধুলামাটি সত্ত্বেও দেবী যাহাদিগকে আপনার বলিয়া কোলে তুলিয়া লন দেউড়ির দরোয়ানগুলা তাহাদিগকে চিনিবে কোন্ লক্ষণ দেখিয়া? তাহারা পোশাক চেনে, তাহারা মানুষ চেনে না। তাহারা উৎপাত করিতে পারে, কিন্তু বিচার করিবার ভার তাহদের উপর নাই। সারস্বতদিগকে অভ্যর্থনা করিয়া লইবার ভার যাঁহাদের উপরে আছে তাঁহারাও নিজে সরস্বতীর সন্তান; তাঁহারা ঘরের লোক, ঘরের লোকের মর্যাদা বোঝেন।’ — ‘সাহিত্যের বিচারক’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ এভাবেই তাঁর অন্তরের যাবতীয় ক্ষোভ উগরে দিয়েছিলেন অযোগ্য অপদার্থ সমালোচকদের উদ্দেশ্যে।
ক্ষিপ্ত জীবনানন্দও একদা প্রাণহীন, বিবেকশূন্য সমালোচকদের প্রতি ছুঁড়ে দিয়েছিলেন তাঁর আকণ্ঠ ঘৃণা :
বলিলাম ম্লান হেসে; ছায়াপিণ্ড দিলো না উত্তর;
বুঝিলাম সে তো কবি নয়— সে যে আরূঢ় ভণিতা:
পাণ্ডুলিপি, ভাষ্য, টীকা, কালি আর কলমের ’পর
ব’সে আছে সিংহাসনে— কবি নয়— অজর, অক্ষর
অধ্যাপক; দাঁত নেই— চোখে তার অক্ষম পিঁচুটি;
বেতন হাজার টাকা মাসে— আর হাজার দেড়েক
পাওয়া যায় মৃত সব কবিদের মাংস কৃমি খুঁটি;’
আসলে সাহিত্য-সমালোচকের কাজটাই খুব ঝুঁকিপূর্ণ। কঠোর সমালোচনাকে মানুষ সহজভাবে নিতে পারে না। কেবল প্রশংসা করলেই মনে মনে খুশি হয়। ‘শনিবারের চিঠি’ অথবা ‘ব্ল্যাকউডস ম্যাগাজিনে’র মতো অপদার্থ সাহিত্য-সমালোচনার ধারা ও রীতি রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ ও কিটসের মতো বড় কবিদেরও রীতিমতো পর্যুদস্ত করে ফেলেছিল। একদা গ্যেটে এই ধরণের বিষাক্ত হুল ফোটানো সমালোচকদের উদ্দেশ্যে লিখেছিলেন : ‘Kill the dog, he is a reviewer.’ রবীন্দ্রনাথও তীব্র ঘৃণায় ‘শনিবারের চিঠি’-কে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। শেলির ধারণা হয়েছিল, কবি কিটস যক্ষ্মারোগে নয়, ‘ব্ল্যাকউডস ম্যাগাজিনে’র তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গাত্মক সমালোচনার আঘাতেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে ২৬ বছর বয়সে মারা গিয়েছিলেন।

অথচ সাহিত্য-সমালোচনাও যে একটা উঁচু মানের শিল্প হয়ে উঠতে পারে তার দৃষ্টান্ত স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। তিনিও বিশ্বাস করতেন : ‘A good criticism is as much a work of art as a good poem.’ তিনিও জানতেন সমালোচনা আসলে : A creation within creation.’
মূলত তিনি Impressionistic criticism এ বিশ্বাসী হলেও একান্তভাবে এই আস্বাদনপন্থী সমালোচনার স্নিগ্ধ ছায়ায় নিজেকে আজীবন বেঁধে রাখেননি। সাহিত্য-সমালোচনার প্রকৃত আদর্শ কোনটি, এ বিষয়ে একবার খুব স্পষ্ট করে তিনি বলেছিলেন : ‘ পূজার আবেগ-মিশ্রিত ব্যাখ্যাই আমার মতে প্রকৃত সমালোচনা; এই উপায়েই এক হৃদয়ের ভক্তি আর-এক হৃদয়ে সঞ্চারিত হয়। অথবা যেখানে পাঠকের হৃদয়েও ভক্তি আছে সেখানে পূজাকারকের ভক্তির হিল্লোল তরঙ্গ জাগাইয়া তোলে। আমাদের আজকালকার সমালোচনা বাজার-দর যাচাই করা, কারণ সাহিত্য এখন হাটের জিনিস। পাছে ঠকিতে হয় বলিয়া চতুর যাচনদারের আশ্রয় গ্রহণ করিতে সকলে উৎসুক। এরূপ যাচাই-ব্যাপারের উপযোগিতা অবশ্য আছে, কিন্তু তবু বলিব—যথার্থ সমালোচনা পূজা, সমালোচক পূজারি পুরোহিত, তিনি নিজের অথবা সর্বসাধারণের ভক্তিবিগলিত বিস্ময়কে ব্যক্ত করেন মাত্র।(রামায়ণ, প্রাচীন সাহিত্য)
অথচ জীবনের সূচনায় মধুসূদনের ‘মেঘনাদবধ কাব্য’কে তিনি হেমচন্দ্রের বৃত্রসংহার কাব্যের তুলনায় নিতান্ত তাচ্ছিল্য করেছিলেন। তার মধ্যে ছিল Comparative criticism এর আভাস। তাকে আর যাই বলা যাক না কেন ‘পূজার আবেগ-মিশ্রিত ব্যাখ্যা’ বলা যায় না। সেদিন তিনি মাইকেল মধুসূদনকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে লিখেছিলেন :
‘মহৎ চরিত্র যদি বা নূতন সৃষ্টি করিতে না পারিলেন, তবে কবি কোন্ মহৎকল্পনার বশবর্ত্তী হইয়া অন্যের সৃষ্ট মহৎ চরিত্র বিনাশ করিতে প্রবৃত্ত হইলেন? কবি বলেন, “I despise Ram and his rabble” সেটা বড় যশের কথা নহে– তাহা হইতে এই প্রমাণ হয় যে, তিনি মহাকাব্য রচনার যোগ্য কবি নহেন। মহত্ত্ব দেখিয়া তাঁহার কল্পনা উত্তেজিত হয় না। নহিলে তিনি কোন্ প্রাণে রামকে স্ত্রীলোকের অপেক্ষা ভীরু ও লক্ষ্মণকে চোরের অপেক্ষা হীন করিতে পারিলেন! দেবতাদিগকে কাপুরুষের অধম ও রাক্ষসদিগকেই দেবতা হইতে উচ্চ করিলেন! এমনতর প্রকৃতিবহির্ভূত আচরণ অবলম্বন করিয়া কোন কাব্য কি অধিক দিন বাঁচিতে পারে? ধূমকেতু কি ধ্রুবজ্যোতি সূর্য্যের ন্যায় চিরদিন পৃথিবীতে কিরণ দান করিতে পারে? সে দুই দিনের জন্য তাহার বাষ্পময় লঘু পুচ্ছ লইয়া, পৃথিবীর পৃষ্ঠে উল্কা বর্ষণ করিয়া, বিশ্বজনের দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়া আবার কোন্ অন্ধকারের রাজ্যে গিয়া প্রবেশ করে।’
পরে অবশ্য মেঘনাদবধ সম্পর্কে এই কট্টর মনোভাব বদলে ফেলে তিনি এই সাহিত্যিক মহাকাব্যটির গভীর প্রশংসা করেছিলেন।
জগদীশ গুপ্তের লঘুগুরু উপন্যাসের নায়িকা একজন গণিকা। রবীন্দ্রনাথ কখনও গণিকাপল্লীতে যাননি। এ বিষয়ে তাঁর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা নেই বলে বইটির বাস্তবধর্মকে তিনি স্বীকার করতে পারেননি। বরং এই উপন্যাসের সমালোচনা করতে গিয়ে তিনি জগদীশ গুপ্তের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে খুব অপ্রত্যাশিতভাবে কটাক্ষ করে লিখেছিলেন : ‘লেখক নিশ্চয়ই অনতিপরিচিতের সন্ধানে রাস্তা ছেড়ে কাঁটাবন পেরিয়ে ও জায়গায় উঁকি মেরে এসেছেন।’
এই জাতীয় ব্যক্তিগত কটাক্ষ জগদীশ গুপ্ত প্রত্যাশা করেননি রবীন্দ্রনাথের কাছে। এই তির্যক আক্রমণকে তিনি বলেছিলেন : আসামীকে ছেড়ে আসামীর জনককে আক্রমণ।
এই জাতীয় কিছু কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে রবীন্দ্রনাথ বাংলা সাহিত্য-সমালোচনার যে উচ্চ আদর্শ স্থাপন করে গেছেন তা আবহমান বাংলা সাহিত্যের বিস্ময়কর ঐশ্বর্য। সমালোচনার ভাষা যে এত মণিকাঞ্চনময় হতে পারে, সমালোচনার গভীরে যে হৃদয়ের এতখানি বিস্তার ঘটতে পারে, অনুভবের ঐশ্বর্যকে যে সমালোচনার রন্ধ্রে রন্ধ্রে এভাবে ছড়িয়ে দেওয়া যেতে পারে তা তিনিই প্রথম আমাদের দেখালেন। সমালোচনাও যে এমন সুখপাঠ্য হয়ে উঠতে পারে তা রবীন্দ্রনাথের আগে এদেশের সাহিত্যে আমরা কেউ ভাবিনি। বঙ্কিমচন্দ্র বঙ্গদর্শন পত্রিকায় যে সম্ভাবনার দুয়ার উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথের হাতে তারই সম্যক ও বিপুল বিস্তার আমাদের সাহিত্য-সমালোচনার ধারাকে অতিশয় ঋদ্ধ করেছে। প্রধানত যেসব বইতে তাঁর মহার্ঘ সমালোচনার রত্নভাণ্ডার পাঠক খুঁজে পাবেন সেগুলি হল : সাহিত্য, সাহিত্যের পথে, সাহিত্যের স্বরূপ, প্রাচীন সাহিত্য, আধুনিক সাহিত্য, লোকসাহিত্য, গ্রন্থ সমালোচনা, সাময়িক সাহিত্য সমালোচনা।
কবিতায়, উপন্যাসে, ছোটোগল্পে, নাটকে, গানে, নিবন্ধে ও চিঠিপত্রে যে রবীন্দ্রনাথকে আমরা পাই তাতে একটা গৌরবময় পরিপূর্ণতা আসে তাঁর সাহিত্য-সমালোচনার অনন্য সম্ভার পাঠ করলে। মানুষের শিল্প-পিপাসার গোড়ার কথাটি তিনি উচ্চারণ করেছেন বড় অবলীলায় :
‘শরীরের পিপাসা ছাড়া আর-এক পিপাসাও মানুষের আছে। সংগীত চিত্র সাহিত্য মানুষের হৃদয়ের সম্বন্ধে সেই পিপাসাকেই জানান দিচ্ছে।’ (তথ্য ও সত্য)
কবিতার স্পষ্টতা অস্পষ্টতা নিয়ে যে আবহমানকালের দ্বন্দ্ব ও বিতর্ক রয়েছে ব্যক্তিগত জীবনে তার মুখোমুখি হয়ে তিনি অসামান্য ভাষায় লিখেছেন :
‘প্রকৃতির নিয়ম-অনুসারে কবিতা কোথাও স্পষ্ট কোথাও অস্পষ্ট, সম্পাদক এবং সমালোচকেরা তাহার বিরুদ্ধে দরখাস্ত এবং আন্দোলন করিলেও তাহার ব্যতিক্রম হইবার জো নাই। চিত্রেও যেমন কাব্যেও তেমনই-দূর অস্পষ্ট, নিকট স্পষ্ট; বেগ অস্পষ্ট, অচলতা স্পষ্ট; মিশ্রণ অস্পষ্ট, স্বাতন্ত্র্য স্পষ্ট। আগাগোড়া সমস্তই স্পষ্ট, সমস্তই পরিষ্কার, সে কেবল ব্যাকরণের নিয়মের মধ্যে থাকিতে পারে; কিন্তু প্রকৃতিতেও নাই, কাব্যেও নাই। অতএব ভাবুকেরা স্পষ্ট এবং অস্পষ্ট লইয়া বিবাদ করেন না, তাঁহারা কাব্যরসের প্রতি মনোযোগ করেন।’ (কাব্য : স্পষ্ট এবং অস্পষ্ট)
যাঁরা ঐতিহাসিক উপন্যাস লেখেন তাঁদের চিরকালই এই অভিযোগের মুখোমুখি দাঁড়াতে হয় যে, তিনি ইতিহাসের পাথুরে সত্যকে লঙ্ঘন করেছেন। এই অভিযোগের বাণে বিদ্ধ হয়েছেন স্বয়ং বঙ্কিমচন্দ্র থেকে সাম্প্রতিককালের কথাশিল্পী সন্মাত্রানন্দ শোভন। এই অভিযোগের এর চিরকালীন উত্তর খুঁজে পাই রবীন্দ্রনাথের একটি চমৎকার সমালোচনা-মূলক নিবন্ধে :
‘এক্ষণে কর্তব্য কী? ইতিহাস পড়িব না আইভ্যান্হো পড়িব? ইহার উত্তর অতি সহজ। দুইই পড়ো। সত্যের জন্য ইতিহাস পড়ো, আনন্দের জন্য আইভ্যান্হো পড়ো। পাছে ভুল শিখি এই সতর্কতায় কাব্যরস হইতে নিজেকে বঞ্চিত করিলে স্বভাবটা শুকাইয়া শীর্ণ হইয়া যায়।
কাব্যে যদি ভুল শিখি ইতিহাসে তাহা সংশোধন করিয়া লইব। কিন্তু যে ব্যক্তি ইতিহাস পড়িবার সুযোগ পাইবে না, কাব্যই পড়িবে সে হতভাগ্য। কিন্তু যে ব্যক্তি কাব্য পড়িবার অবসর পাইবে না, ইতিহাস পড়িবে, সম্ভবত তাহার ভাগ্য আরো মন্দ।’ (ঐতিহাসিক উপন্যাস)
ছড়ার মধ্যে আমরা দেখতে পাই প্রসঙ্গ থেকে দুম করে প্রসঙ্গান্তরে চলে যাবার এক অদ্ভুত প্রবণতা। তার মধ্যে পর্যাপ্ত আলো আর রাশি রাশি আনন্দ ছড়িয়ে দেন ছড়াকার। সেইসব ছেলে ভুলানো ছড়া সাবালক পাঠকদেরও অন্তরে চিরকাল নির্মল আনন্দ সঞ্চারিত করে এসেছে। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘লোকসাহিত্য’ গ্রন্থে এ বিষয়ে মনোরম আলোকপাত করেছেন :
‘ছড়ার রাজ্য তেমন রাজ্যই নহে। সেখানে সকল ব্যাপারই এমন আনায়াসে ঘটিতে পারে এবং এমন অনায়াসে না ঘটিতেও পারে যে, তাহাকেও কোনো কিছুর জন্যই কিছুমাত্র দুশ্চিন্তাগ্রস্ত বা ব্যস্ত হইতে হয় না। অতএব আগামী কল্য শ্রীমতী যমুনাবতীর বিবাহের দিন স্থির হইলেও সে ঘটনাটাকে বিন্দুমাত্র প্রাধান্য দেওয়া হয় নাই। তবে সে কথাটা আদৌ কেন উত্থাপিত হইল তাহার জবাবদিহির জন্যও কেহ ব্যস্ত নহে। কাজিফুল যে কী ফুল আমি নগরবাসী তাহা ঠিক করিয়া বলিতে পারি না, কিন্তু ইহা স্পষ্ট অনুমান করিতেছি যে, যমুনাবতী-নামক কন্যাটির আসন্ন বিবাহের সহিত উক্ত পুষ্পসংগ্রহের কোনো যোগ নাই। এবং হঠাৎ মাঝখান হইতে সীতারাম কেন যে হাতের বলয় এবং পায়ের নূপুর ঝুম্ঝুম্ করিয়া নৃত্য আরম্ভ করিয়া দিল আমরা তাহার বিন্দুবিসর্গ কারণ দেখাইতে পারিব না।’ (ছেলে ভুলানো ছড়া ১)
অযোগ্য সমালোচকদের তিনি বলেছেন ‘দেউড়ির দারোয়ান’। তাদের দৃষ্টিভঙ্গি অগভীর, পল্লবচারী, তাদের পুঁজিও যৎসামান্য। কিন্তু সাহিত্যক্ষেত্রে কিছু মানুষ চিরকালই গভীর আস্বাদন-ক্ষমতা আর পরিব্যাপ্ত হৃদয় নিয়ে আবির্ভূত হন। তাঁরাই প্রকৃত সাহিত্য-সমালোচক। তাঁদের প্রতি নিবিড় শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি লিখেছেন :
‘এক-একজনের পরখ করিবার শক্তিও স্বভাবতই অসামান্য হইয় থাকে। যাহা ক্ষণিক, যাহা সংকীর্ণ, তাহা তাঁহাদিগকে ফাকি দিতে পারে না; যাহা ধ্রুব, যাহা চিরন্তন, এক মুহূর্তেই তাহা তাঁঁহারা চিনিতে পারেন। সাহিত্যের নিত্যবস্তুর সহিত পরিচয়লাভ করিয়া নিত্যত্বের লক্ষণগুলি তাঁহারা জ্ঞাতসারে এবং অলক্ষ্যে অন্তঃকরণের সহিত মিলাইয়া লইয়াছেন; স্বভাবে এবং শিক্ষায় তাহারা সর্বকালীন বিচারকের পদ গ্রহণ করিবার যোগ্য।’ (সাহিত্যের বিচারক)
Impressionistic criticism এর এক হিরণ্ময় দৃষ্টান্ত হল ‘প্রাচীন সাহিত্য’ এবং ‘আধুনিক সাহিত্য’। বিশেষত ‘প্রাচীন সাহিত্য’ পাঠ করে আমরা সংস্কৃত সাহিত্যকে নতুন করে আবিষ্কার করি। মহাকবি ও নাট্যকার কালিদাসকে সম্পূর্ণ নতুনভাবে উপলব্ধি করি। মেঘদূতের নির্বাসিত যক্ষ আর আমাদের চোখে নিছক একজন বিরহী যক্ষ হয়ে থাকে না। সে হয়ে ওঠে পৃথিবীর সমস্ত বিরহী মানুষের বিষাদ ও ব্যাকুলতার প্রতীক :
’আমরা প্রত্যেকে নির্জন গিরিশৃঙ্গে একাকী দণ্ডায়মান হইয়া উত্তরমুখে চাহিয়া আছি; মাঝখানে আকাশ এবং মেঘ এবং সুন্দরী পৃথিবীর রেবা সিপ্রা অবন্তী উজ্জয়িনী, সুখ সৌন্দর্য-ভোগ-ঐশ্বর্যের চিত্রলেখা—যাহাতে মনে করাইয়া দেয়, কাছে আসিতে দেয় না—আকাঙ্ক্ষার উদ্রেক করে, নিবৃত্তি করে না। দুটি মানুষের মধ্যে এতটা দূর!
কিন্তু এ কথা মনে হয়, আমরা যেন কোনো-এক কালে একত্র এক মানসলোকে ছিলাম, সেখান হইতে নির্বাসিত হইয়াছি।’ (মেঘদূত)
‘কাব্যের উপেক্ষিতা’ পড়ে আমরা অবাক হয়ে ভেবেছি, এতকাল আমরাও তো রামায়ণ পড়েছি, কিন্তু কখনও তো ভাবিনি সীতার দুঃখের চাইতে ঊর্মিলার দুঃখ এত গভীর, এত গোপন। পাঠক রবীন্দ্রনাথ যে কত বড়, কত সংবেদনশীল, কতখানি দিব্যদৃষ্টিসম্পন্ন তা উপলব্ধি করি ‘কাব্যের উপেক্ষিতা’ পাঠ করে :
‘সীতার অশ্রুজলে ঊর্মিলা একেবারে মুছিয়া গেল।’
‘লক্ষ্মণ তো বারো বৎসর ধরিয়া তাঁহার উপাস্য প্রিয়জনের প্রিয়কার্যে নিযুক্ত ছিলেন—নারী-জীবনের সেই বারোটি শ্রেষ্ঠ বৎসর ঊর্মিলার কেমন করিয়া কাটিয়াছিল? সলজ্জ নবপ্রেমে আমোদিত বিকচোন্মুখ হৃদয়মুকুলটি লইয়া স্বামীর সহিত যখন প্রথমতম মধুরতম পরিচয়ের আরম্ভসময় সেই মুহূর্তে লক্ষ্মণ সীতাদেবীর রক্তচরণক্ষেপের প্রতি নতদৃষ্টি রাখিয়া বনে গমন করিলেন—যখন ফিরিলেন তখন নববধূর সুচিরপ্রণয়ালোকবঞ্চিত হৃদয়ে আর কি সেই নবীনতা ছিল? পাছে সীতার সহিত ঊর্মিলার পরম দুঃখ কেহ তুলনা করে, তাই কি কবি সীতার স্বর্ণমন্দির হইতে এই শোকাজ্জ্বলা মহাদুঃখিনীকে একেবারে বাহির করিয়া দিয়াছেন—জানকীর পাদপীঠপার্শ্বেও বসাইতে সাহস করেন নাই?’ (কাব্যের উপেক্ষিতা)
অভিজ্ঞান শকুন্তলম পাঠ করে মহাকবি গ্যেটে বলেছিলেন, এই নাটকে তরুণ বৎসরের ফুল আর পরিণত বৎসরের ফল একত্রে দেখা যায়। গ্যেটেকেও ছাড়িয়ে গেলেন রবীন্দ্রনাথ। তাঁর দৃষ্টি ছুঁয়ে শকুন্তলার নবজন্ম হল। এমন অবিস্মরণীয় সুন্দর বিশ্লেষণ আমাদের দৃষ্টিকে মর্ত থেকে স্বর্গের দিকে প্রসারিত করে :
‘মেঘদূতে যেমন পূর্বমেঘ ও উত্তরমেঘ আছে, পূর্বমেঘে পৃথিবীর বিচিত্র সৌন্দর্য পর্যটন করিয়া উত্তরমেঘে অলকাপুরীর নিত্যসৌন্দর্যে উত্তীর্ণ হইতে হয়, তেমনি শকুন্তলায় একটি পূর্বমিলন ও একটি উত্তরমিলন আছে। প্রথম-অঙ্ক-বর্তী সেই মর্তের চঞ্চলসৌন্দর্যময় বিচিত্র পূর্বমিলন হইতে স্বর্গতপোবনে শাশ্বত-আনন্দময় উত্তরমিলনে যাত্রাই অভিজ্ঞানশকুন্তল নাটক।’ (শকুন্তলা)
মহাকাব্যের দুন্দুভিনিনাদের মধ্যে বসে যে কবি একান্ত নিভৃতে প্রথম আধুনিক গীতিকবিতার নান্দীপাঠ করেছিলেন, সেই বিহারীলাল চক্রবর্তী সম্পর্কে আলোকপাত করতে গিয়ে তিনি যা বলেছিলেন তা এখন প্রবাদে পরিণত হয়েছে :
‘সে প্রত্যুষে লোক জাগে নাই এবং সাহিত্যকুঞ্জে বিচিত্র কলগীত কুজিত হইয়া উঠে নাই। সেই ঊষালোকে কেবল একটি ভোরের পাখি সুমিষ্ট সুন্দর সুরে গান ধরিয়াছিল। সে সুর তাহার নিজের।
ঠিক ইতিহাসের কথা বলিতে পারি না–কিন্তু আমি সেই প্রথম বাংলা কবিতায় কবির নিজের সুর শুনিলাম।’ (বিহারীলাল)

বঙ্কিমচন্দ্রের মেজদা সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ছিলেন এক আশ্চর্য স্বভাবের বিরল প্রতিভাবান মানুষ। তাঁর সেই বিখ্যাত উক্তি ‘বন্যেরা বনে সুন্দর, শিশুরা মাতৃক্রোড়ে’ এখন কিংবদন্তির মতো লোকের মুখে মুখে ফেরে। লেখালেখির ক্ষেত্রে আরও একটু যত্নবান হলে তিনি হয়ত খ্যাতিতে বঙ্কিমচন্দ্রকেও অতিক্রম করে যেতেন। কিন্তু আত্মউদাসীন এই মানুষটি নিতান্ত হেলাফেলায় নষ্ট করেছেন সেই সম্ভাবনাকে। রবীন্দ্রনাথ তাঁর সেই আত্মতাচ্ছিল্যকে বড় নিখুঁতভাবে তুলে ধরেছেন :
‘কোনো কোনো ক্ষমতাশালী লেখকের প্রতিভায় কী একটি গ্রহদোষে অসম্পূর্ণতার অভিশাপ থাকিয়া যায়; তাঁহারা অনেক লিখিলেও মনে হয় তাঁহাদের সব লেখা শেষ হয় নাই। তাঁহাদের প্রতিভাকে আমরা সুসংলগ্ন আকারবদ্ধভাবে পাই না; বুঝিতে পারি তাহার মধ্যে বৃহত্ত্বের মহত্ত্বের অনেক উপাদান ছিল, কেবল সেই সংযোজনা ছিল না যাহার প্রভাবে সে আপনাকে সর্বসাধারণের নিকট সর্বশ্রেষ্ঠ উপায়ে প্রকাশ ও প্রমাণ করিতে পারে।
সঞ্জীবচন্দ্রের প্রতিভা পূর্বোক্ত শ্রেণীর। তাঁহার রচনা হইতে অনুভব করা যায় তাঁহার প্রতিভার অভাব ছিল না, কিন্তু সেই প্রতিভাকে তিনি প্রতিষ্ঠিত করিয়া যাইতে পারেন নাই। তাঁহার হাতের কাজ দেখিলে মনে হয়, তিনি যতটা কাজে দেখাইয়াছেন তাঁহার সাধ্য তদপেক্ষা অনেক অধিক ছিল। তাঁহার মধ্যে যে পরিমাণে ক্ষমতা ছিল সে পরিমাণে উদ্যম ছিল না।
তাঁহার প্রতিভার ঐশ্বর্য ছিল কিন্তু গৃহিণীপনা ছিল না।’ (সঞ্জীবচন্দ্র)
সাহিত্যক্ষেত্রে অগ্রজ বঙ্কিমচন্দ্র সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের ছিল আজীবন গভীর শ্রদ্ধা। ‘জীবনস্মৃতি’তে তিনি লিখেছিলেন : ‘বঙ্কিমের বঙ্গদর্শন আসিয়া বাঙালির হৃদয় একেবারে লুঠ করিয়া লইল।’
বঙ্কিমের উপন্যাসে নানা ত্রুটি আছে। কিন্তু ভাষাশিল্পের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন সেকালের মুকুটহীন সম্রাট। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর উপন্যাসগুলিকে সস্তা হিন্দি সিনেমার চাইতেও অবাস্তব ও অস্বাভাবিক বলে ধিক্কার জানালেও ভাষাশিল্পী বঙ্কিমের কৃতিত্বকে অপরিমেয় শ্রদ্ধার সঙ্গে স্বীকার করেছেন। রবীন্দ্রনাথও তাঁর ‘আধুনিক সাহিত্য’ গ্রন্থে তাঁর অননুকরণীয় ভাষায় বঙ্কিমচন্দ্রের ভাষার সৌন্দর্যকে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন অকপটে :
‘পূর্বে কী ছিল এবং পরে কী পাইলাম তাহা দুই কালের সন্ধিস্থলে দাঁড়াইয়া আমরা এক মুহূর্তেই অনুভব করিতে পারিলাম। কোথায় গেল সেই অন্ধকার,সেই একাকার, সেই সুপ্তি, কোথায় গেল সেই বিজয়-বসন্ত, সেই গোলেবকাওলি, সেই-সব বালক-ভুলানো কথা–কোথা হইতে আসিল এত আলোক, এত আশা, এত সংগীত, এত বৈচিত্র্য। বঙ্গদর্শন যেন তখন আষাঢ়ের প্রথম বর্ষার মতো ‘সমাগতো রাজবদুন্নতধ্বনিঃ’।’ (বঙ্কিমচন্দ্র)
সাহিত্য-সমালোচনার যে ধ্রুব আদর্শ তিনি তৈরি করে দিয়ে গেছেন তা আজও অম্লান হয়ে আছে :
‘সাহিত্যের বিচার করিবার সময় দুইটা জিনিস দেখিতে হয়। প্রথম, বিশ্বের উপর সাহিত্যকারের হৃদয়ের অধিকার কতখানি, দ্বিতীয়, তাহা স্থায়ী আকারে ব্যক্ত হইয়াছে কতটা।
সকল সময় এই দুইয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য থাকে না। যেখানে থাকে সেখানেই সোনায় সোহাগা।
কবির কল্পনাসচেতন হৃদয় যতই বিশ্বব্যাপী হয় ততই তাঁহার রচনার গভীরতায় আমাদের পরিতৃপ্তি বাড়ে। ততই মানববিশ্বের সীমা বিস্তারিত হইয়া আমাদের চিরন্তন বিহারক্ষেত্র বিপুলতা লাভ করে।’ (সাহিত্যের তাৎপর্য)
রবীন্দ্রনাথ আমাদের কাছে ‘সব পেয়েছির দেশ’। বাংলা ভাষার রক্তে মাংসে মজ্জায় মিশে আছেন তিনি। আমাদের সারাজীবনের সমস্ত গোপন ও ব্যক্ত অনুভূতিকে তিনি তাঁর গানে বেঁধেছেন অবলীলায়। দুই বঙ্গের জাতীয় সঙ্গীতে প্রতিদিন গুঞ্জরিত হন তিনি। দুই বাংলার আকাশে বাতাসে মাটিতে ও জলে যেখানেই আঙুল ছোঁয়াই সেখানেই তাঁর স্পর্শ। আমাদের ষড়ঋতুর সুখ দুঃখ মিলন বিরহের নিত্যসঙ্গী তিনি। সাহিত্যের যে শাখাতেই হাত রেখেছেন তিনি সেখানেই আশ্চর্য সব সোনার ফসল ফলেছে। বাঙালির শ্রেষ্ঠ প্রেমিকের নাম রবীন্দ্রনাথ। তিনি পান্থজনের চিরসখা। চির আশ্রয়।
Comments
Post a Comment