আলম জাহাঙ্গীর
গ্রাফিতি। একটা কাউন্টার-কালচারের নাম। বুজুর্গগণ ইদানিং বলছেন- পাঙ্ক কালচারের পর সবচেয়ে চর্চিত জীবনযাপন পদ্ধতি হলো গ্রাফিতি
এই শিল্পীদের কাছে পৃথিবীর সব দেয়ালই একেকটা ক্যানভাস। প্রচলিত নীতি বা সিদ্ধান্তের শৈল্পিক প্রতিবাদের মধ্যে দিয়ে চলমান ইস্যুকে সবার নজরে আনতে গ্রাফিতির রয়েছে স্বতঃস্ফূর্ত ভূমিকা। ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকা যে দেয়ালের শুধু শ্রবণক্ষমতা ছিল, তার মুখে এখন বোল ফুটেছে। সময়ের মতি-গতিকে পরিহাস করা একেকটা গ্রাফিতি যেন শহরের শরীরে খোদাই করা একেকেটা ট্যাটু। এই ট্যাটু কারিগরদের বলা হয়ে থাকে ‘গেরিলা আর্টিস্ট’। গেরিলা যোদ্ধাদের মত তাদেরও যে ঝোপ বুঝে কোপ মারতে হয়। রাতের আঁধারে টার্গেট করা দেওয়ালের গায়ে আর্টওয়ার্ক সাঁটিয়ে দিয়েই চম্পট দিতে ওস্তাদ এই লাইনের বান্দারা।
সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বের কিছু কিছু দেশ ‘গ্রাফিতি’কে বৈধ করেছে শর্তসাপেক্ষে; ধরা যাক, ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোর কথা, সেখানে রিও পৌরসভার অনুশাসন অনুযায়ী কিছু বাছাই- এবং তালিকাবদ্ধ- সরকারি ভবন ছাড়া বাকি সব প্রকাশ্য স্থানে দেয়াল অঙ্কন চলবে; তবে সেই সব গ্রাফিতি বাণিজ্যিক, যৌনরসাত্মক, জাতিবাদী কিংবা বৈষম্যবাদি হলে চলবে না৷। অধিকাংশ দেশে এখনও গ্রাফিতিকে (অ্যাকাডেমিক) চারু শিল্পের শত্রু বলে মনে করা হয়। সেসব দেশের নগর ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষও গ্রাফিতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স মুডে থাকে। যেমন, সিরিয়ায় একটি প্রবাদ চালু আছে “দেওয়াল হচ্ছে উন্মাদের আবর্জনা”! যদিও, সিরিয় আন্দোলনে গ্রাফিতির ভদ্রতায় দেয়ালই ফাইন্যালি হয়ে উঠে মুক্তবাকের অন্যতম জমিন।
মুনাফাভিত্তিক রাজনীতি চর্চার কালে পলিসি মেকার, ইন্টেলেকচুয়ালরা যখন ‘চাচা আপন প্রাণ বাঁচা’র লাইনে আরামে দাঁড়িয়ে থাকেন, তখন গ্রাফিতিই যেন উঠে দাঁড়ায় নিঃশব্দ শ্লোগানের অস্থিরতায়। ধারণ করে যৌবনের ভাষা, রচনা করে শ্লেষের পঙতিমালা।
ঐতিহাসিক বাস্তবতার ঐতিহ্য বজায় রেখে প্রতিষ্ঠানের লোভাতুর অফারে যেভাবে অনেকেই নাম লিখিয়ে থাকেন অবসরপ্রাপ্ত প্রগতিশীলের খাতায়, তেমনি অনেক ‘গেরিলা আর্টিস্ট’কেও আকছার বিকোতে দেখা যায় ক্রিস্টি বা সোথবির নিলামঘরে। কিন্তু এতে টেনশন করার কিছু নাই।
ঘটমান অতীত বা বর্তমান কালের প্রায় অধিকাংশ বিক্ষোভ-প্রতিবাদ-প্রতিরোধের আন্দোলনে গ্রাফিতি হয়ে উঠেছে নৈমিত্তিক অনুষঙ্গ। দিল্লীর ধর্ষণ বিরোধী আন্দোলন, অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট, ইউক্রেন সঙ্কট, অ্যান্টি ইজরাইল মুভমেন্ট, যুক্তরাষ্ট্রে মারিজুয়ানা বৈধকরণ আন্দোলন অথবা একদম তাজা ইভেন্ট- কলকাতার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী লাঞ্চনার প্রতিবাদে জমে উঠা ‘#হোক কলরব’- কোথায় নেই গ্রাফিতি।
বাংলাদেশে গ্রাফিতির রেগুলার প্র্যাক্টিস না থাকলেও বিচ্ছিন্নভাবে এর চর্চা চোখে পড়ে ঢাকা, চট্টগ্রাম সহ বিভিন্ন শহরের দেয়ালের গতরে। স্বাধীন বাংলার লোকালয় মৃদু মানুষে পরিপূর্ণ হলেও লোকাল গ্রাফিতিগুলিতে দেখা যায় উড়াধুরা চার্জ। লেখকের নাম কখনো চোখে পড়ে আবার কখনোবা অজ্ঞাতই রয়ে যায়। পরন্তু, গ্রাফিতিটা মস্তিষ্কের শো-কেসে শেল্ভড হয়ে যায় আজীবন সদস্যের মতো। এইক্ষণে, স্মরণ করা যেতে পারে আইজুদ্দিনকে। গ্রাফিতিবিহীন কিন্তু রাজনৈতিক ও বিজ্ঞাপনী চিকাবহুল ঢাকা শহরে তিনিই (আছেন/) ছিলেন একমাত্র ট্যাগ মাস্টার। এই শহরের খুব কম দেয়াল আছে যারা ‘কষ্টে আছে আইজুদ্দিন’ এর মধ্যে দিয়ে জনৈক আইজুদ্দিনের কষ্ট ধারণ করে নাই। ট্যাগিং টাইপোগ্রাফি বেইজড একপ্রকার গ্রাফিতি আর্ট।
রক্ষণশীলদের চোখে তথাকথিত পরিপাটি নগর ও দালান নকশায় গ্রাফিতি(গুলি) আটকে থাকে স্ট্রেস মার্ক হিসেবে। লনডনে শহর নোংরা করার দায়ে গ্রাফিতি লেখকদের চিহ্নিত করা হয়েছে নৈরাজবাদী বা অ্যানার্কিস্ট হিসেবে। স্বাভাবিকভাবেই কৌতুহলের উদ্রেক হয় গ্রাফিতি বা দেয়াল শিল্পগুলির বক্তব্য সম্পর্কে! খানিক নজর করে দেখলেই বোঝা যায়, এই শিল্পকর্মগুলি জলবায়ু পরিবর্তনের মত বৈশ্বিক মামদোবাজির সমালোচনা/নাগরিক অধিকার/যুদ্ধবিরোধী আওয়াজ ও শান্তির বার্তার মত ইত্যাদি রাজনৈতিক ইস্যুতে নাগরিক ইশতেহারের ভূমিকা পালন করে। তাই, প্রায় সময়ই গ্রাফিতি অ(ন)র্থ উৎপাদন করে সামষ্টিক অবদমনের গালে অটোগ্রাফ রূপে একটি বা কয়েকটি বকেয়া চড় বসিয়ে। পাঠক-পাঠিকা ভুলে গেলেন কি, ২০১৪ সনের ব্রাজিল বিশ্বকাপ চলাকালীন সময়ে স্ট্রিট আর্টিস্ট পাউলো ইতোর আঁকা ভাইরাল মর্যাদাপ্রাপ্ত গ্রাফিতিটির কথা। যেখানে ক্ষুধার্ত শিশুর সামনে খাবারের বদলে ফুটবল পরিবেশন করা হয়েছিলো। আয়োজক দেশ হিসেবে ব্রাজিলের অমিতব্যয়ী আচরণের বাস্তবতা তুলে ধরতে একটি গ্রাফিতিই হয়ে উঠেছিলো প্রতিবাদ ও মৌলিক অধিকার আদায়ের হাতিয়ার।
বিস্ময়কর, ঐতিহাসিক, মজার, অপার্থিব সব ক্যারেক্টাররা ঘুমিয়ে থাকে এই শিল্পীদের ভাবনার বারান্দা জুড়ে। যারা জেগে উঠে রং-রেখার কাঁপনে। তাঁদের কাজ বরাবরই দর্শককে ভূ-মণ্ডল অথবা চাঁদের কথা ভুলে অন্যকোন (হয়তোবা সত্যি) মণ্ডলে ট্রিপের আবেগকে উস্কিয়ে দিয়ে থাকে। পেইন্টিং, ভাস্কর্য, ভিডিও আর্ট অথবা ইন্সটলেশন আর্ট সবখানেই রঙ-কল্পনা-(অ)প্রকৃত দৃশ্যের ডামাডোলের বুনটের মধ্যে দিয়ে তারা নির্মাণ করেন হেঁয়ালি ও প্রহেলিকাময় চিহ্নের এক অকাল্ট দুনিয়া। সেই দুনিয়ায় রাজনীতি ও ব্যক্তি-সত্ত্বা পরস্পরের মুখোমুখি দাঁড়ায় দিগম্বর চম্পু হয়ে। একস্ট্রা অফার হিসেবে অডিয়েন্সরে ওয়েলকাম কইরা আগায় দেন এক আনইজি মেইজ সিটির হাইওয়েতে।#aj
wicketbd@gmail.com
Comments
Post a Comment